রিপোর্ট করার পূর্বে একটু বুঝেশুনে করা কি উচিৎ নয়?

15391068_10154324495293515_1760066700445813296_n

আয়রন ইনজেকশন পেয়ে যে রোগী মরে যেতে পারে সেটা এই সাংবাদিক ভাইয়ের রিপোর্টের মাধ্যমে জানলাম। আর শমরিতা হাসপাতালের বিরিদ্ধে অভিযোগটা দেখে আরও বিস্মিত হলাম। কারন এই হাসপাতালে আমি দেড় বছর কাজ করেছি এবং অনেক কিছু শিখেছি। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, এই দেড় বছরে একটি দিনও প্রফেশনাল নেগ্লেজেন্সি কিংবা ম্যাল প্র্যাকটিস নামক ব্যাপারটি লক্ষ্য করিনি। এই হাসপাতালের সিনিয়র এবং জুনিয়র চিকিৎসকদের সবাই দক্ষ এবং যেখানে প্রফেসার এম, এন, আলম এবং দ্বীন মোহাম্মদ রোগী দেখেন সেই হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পূর্বে দুবার ভেবে দেখা উচিৎ।

বলে রাখা ভালো শমরিতা কোন ক্লিনিক নয়। এটা একটি হাসপাতাল।

রিপোর্টার সাহেব যে বলে দিলেন আয়রন ইনজেকশন দেবার জন্য রোগীর মৃত্যু হয়েছে সেটা কি উনি মেডিকেল লজিক দিয়ে প্রমান করতে পারবেন?

গর্ভাবস্থায় যদি কারো মাঝারি থেকে বেশী মাত্রার রক্ত শূন্যতা থাকে তাহলে তাদেরকে পাররেন্টাল আয়রন থেরাপী দেবার ইন্ডিকেশন আছে। এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকগণ আয়রন ডেক্সত্রানের চেয়ে আয়রন সুক্রোজকে বেশী প্রেফার করেন কারন আয়রন সুক্রোজে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার – হাইপারসেন্সিটিভিটির – মাত্রা ডেক্সত্রানের চেয়ে অনেক কম। আয়রন ডেক্সত্রানে ‘ডেক্সত্রান’ মোয়েটির জন্য হাইপারসেন্সিটিভিটি হয় আর তাই এটার ব্যবহার তেমন একটা হয় না বললেই চলে।

২০১৩ সালে NCBI-তে প্রকাশিত একটি স্টাডির মতে,

The all-event reporting rates for iron dextran, sodium ferric gluconate, and iron sucrose were 29.2, 10.5, and 4.2 reports per million 100mg dose equivalents,respectively, while the all-fatal-event reporting rates were 1.4, 0.6, and 0.0 reports per million 100mg dose equivalents, respectively. Iron sucrose appears to have a favorable safety profile and is an alternative to other forms of parenteral iron therapy in correction of depletion of iron stores. Rare anaphylactic reactions with iron sucrose have been reported in 0.002% of cases.

অর্থাৎ, আয়রন সুক্রোজে কোন ধরনের তীব্র পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া, অ্যানাফাইলেকটিক রিএক্সনের রেট কম এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আর কোন রোগীকে ওরাল আয়রন থেরাপী কিংবা ইঞ্জেক্সনের জন্য মৃত্যু বরণ করতে হলে তার রক্তে আয়রনের পরিমান ১০০০ মাইক্রোগ্রাম/ডিএলের ও বেশী হতে হবে যেটা আইভি থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসারত অবস্থায় হওয়াটা এক কথায় অসম্ভব ব্যাপার।

যিনি মারা গিয়েছেন তার রক্তশূন্যতার মাত্রা হয়ত এতটা বেশী ছিলো যে উনি এনিমিক হার্ট ফেইলরের ষ্টেজে চলে গিয়েছিলেন যেটা একটি ফাটাল কন্ডিশন এবং প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এরকম কন্ডিশন গুলো খুবই ক্রিটিকাল এবং মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশী থাকে। এখানে চিকিৎসকের ভুল কি করে হয় কিংবা ভুল মেডিসিন দেবার কারনে রোগীর মৃত্যু কিভাবে হয় সেটা বুঝতেই পারলাম না।

কোন রিপোর্ট করার পূর্বে একটু বুঝেশুনে করা কি উচিৎ নয়?

আপানদের কথা মতে চিকিৎসকরা ভুল করেন কিন্তু এই ভুল রিপোর্টটি করে আপনি কি নিজের পেশার প্রতি সুবিচার করেছেন?

ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার

একজন রোগীকেও যথেষ্ট দায়িত্বশীল হতে হবে

image-25043

প্রথমত, বহির্বিভাগ এবং চেম্বারে রোগী ছাড়া শুধু রোগীর রিপোর্ট নিয়ে দেখাতে আসটা ঠিক নয়। রোগীর রিপোর্টে যদি উল্লেখযোগ্য কিছু থাকে তাহলে সেটা রোগীর সাথে ডিসকাস করা খুবই জরুরী। রোগীর অভিবাবকদের সাথে ডিসকাস করে কিন্তু কোন লাভ হয় না।

তারপর, রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে যদি কোন মেডিসিন প্রেস্ক্রাইভ করতে হয় তাহলে অবশ্যই রোগী আরও একবার ভালোভাবে এক্সামিন করে এবং আরও একটু হিস্ট্রি নিয়ে সেটা প্রেস্ক্রাইভ করতে হয়। সেজন্য রোগীর উপস্থিত থাকটা খুবই জরুরী।

সর্বোপরি, একজন চিকিৎসক অনেক রোগী দেখেন। তার পক্ষে সব রোগীর কথা মনে রাখাটা সম্ভব নয়। সেজন্য রিপোর্টের সাথে, সাথে রোগীকেও নিয়ে আসবেন। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীর লোক এই বলে অজুহাত দেয়, রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ তাই তাকে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি যেটি ডাহা মিথ্যা কথা। কারন রোগীর অবস্থা যদি খুব খারাপই হয় তাহলে তাকে বাসায় রাখার কোন মানেই হয় না।

রোগীদেরকে নিয়ে কখনও মিথ্যা কথা বলা উচিৎ নয়।

বহির্বিভাগে আমার সাথে কর্তব্যরত রেসিডেন্টদের আমি বলে দেই তারা যেন এই ধরনের রোগীর লোকদের রিপোর্ট গুলো না দেখে। কারন রোগী না দেখে কোন কিছু অ্যাডভাইস করলে পরবর্তীতে যদি রোগীর কিছু হয় তাহলে উল্টো তারাই বিপদে পড়বে।

এই দেশের লোক চিকিৎসা ঠিকই নিবে কিন্তু রোগীর পান থেকে চুন খসলে দাঁ-বটি নিয়ে চিকিৎসককে ঠিকই খুন করতে আসবে।

দ্বিতীয়ত, পাড়ার ফার্মেসী থেকে ব্লাডপ্রেশার মাপিয়ে আমাদের কাছে আসবেন না। এসব ফার্মেসীতে কর্তব্যরত ব্যক্তিগন চিকিৎসক নয় এবং হাইপারটেনশনের মেডিসিন বিক্রি করার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রেশার একটু বেশী বলেন যেন আপনি ভয় পেয়ে তার কাছ থেকে মেডিসিন কিনেন। ব্লাডপ্রেশার কিভাবে মাপতে হয় সেটা তারা জানে তো নাই বরঞ্চ ভুলভাল রিডিং দিয়ে রোগীকে বিভ্রান্ত করে।

একজন রোগীর ব্লাডপ্রেশারের রিডিং হাইপারটেনশন না থাকলেও বেশী আসতে পারে যেটা White Coat Hypertension নামে পরিচিত। এটা কিন্তু হাইপারটেনশন নয়। কিংবা ব্লাডপ্রেশার কখন কি কারনে ফ্লাকচুয়েট করে সেটি একজন দোকানদার কখনও বুঝতে পারবে না।

অতঃপর অযথা টাকা খরচ হবে এই কথা না ভেবে নিজের ব্লাডপ্রেশার সর্বদা একজন চিকিৎসক দিয়ে মাপাবেন। নিজের জীবনটা নিশ্চয় টাকার চেয়ে বেশী মূল্যবান নয়।

তৃতীয়ত, কোন মেডিসিন চলাকালীন সময়, ধূমপান, পান, জর্দা, অ্যালকোহল পরিহার করুন। কারন তামাক এবং অ্যালকোহল মেডিসিনের কাজে বাঁধা দেয়। এখন আমি মেডিসিন লিখে দিলাম কিন্তু আপনি আপনার বদভ্যাস ত্যাগ করলেন না তাহলে আমার এবং আপনার দুজনের পরিশ্রমই বৃথা।

অনেক রোগীই এসে বলেন, মেডিসিনে কাজ হচ্ছে না। তখন আমরা জিজ্ঞেস করি, আপনি আপনার বদভ্যাস ত্যাগ করেছেন কিনা? তখন উনারা হাসতে থাকেন। উনারা মনে করেন আমাদের অ্যাডভাইস করা মেডিসিনে উনারা ভালো হয়ে যাবেন এবং বীরের মতো ধূমপান, জর্দা এবং অ্যালকোহল পান করতে থাকবেন।

মেডিসিন রোগী সুস্থ করতে প্রেস্ক্রাইভ করা হয়, বদভ্যাস গুলোকে বৈধ করতে নয়।

পরিশেষে, আপনি যদি কোন চিকিৎসার ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন অপিনিয়ন নিতে চান তাহলে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের অপিনিয়ন নিন। পাশের বাড়ির ভাই-ভাবী কিংবা বলদ আত্মীয়দের অপিনিয়ন নিয়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনবেন না।

ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার