ব্যাপারটি যে Sepsis

হঠাৎ করেই দেখা গেল কেউ একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার লক্ষন গুলোর মধ্যে হয়ত ছিলো  প্রচণ্ড জ্বর এবং তার সাথে শরীরের কোন একটি অংশে ব্যথা, পাতলা পায়খানা কিংবা বমি করা। এখন এসব লক্ষন গুলোর জন্য যে একজন রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট লাগতে পারে এবং মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে সেটি এই দেশের অনেকেরই ধরানা নেই। এই ধরনের রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি হবার পরামর্শ দিলে কিংবা এদের হঠাৎ করে মৃত্যু হলে,  চিকিৎসকের পয়সা কামানোর ধান্দা কিংবা অবহেলাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে, রোগীর লোকজন অজ্ঞতা বশত এই কাজটি করে থাকেন।

জ্বর, শরীরের কোন একটি অংশে ব্যথা, বমি কিংবা পাতলা পায়খানার জন্য একজন রোগীর আইসিইউ কেনই বা লাগবে কিংবা তার মৃত্যুই বা কেন হবে? এসব লক্ষন গুলো তখনই একজন রোগীর মধ্যে দেখা দেয় যখন তার শরীরে কোন রোগ জীবাণু বাসা বাঁধে (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ফাঙ্গাস)। কিছু রোগ জীবাণুর বিস্তার এত দ্রুত হয় যে সেটি রোগীকে একটি মরনাপন্ন অবস্থাতে নিয়ে যায় যার নাম Sepsis এবং এটির জন্য একজন রোগীর মাল্টি-অর্গান- ডিসফাংশন ডেভেলপ করে অর্থাৎ, শরীরের একের অধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমনঃ হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ কিংবা কিডনীর কার্যকারিতা কমে যায় যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় Septic Shock বলা হয়। এই প্রক্রিয়াটি এতই দ্রুত গতিতে হতে থাকে যে একসময় এসব অর্গান গুলোর কাজ করা বন্ধ হয়ে যায় এবং রোগী মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে।

২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ররি সানটন নামে এক ১২ বছরের ছেলে শুধু মাত্র বমি এবং পায়ে ব্যথার কমপ্লেইন নিয়ে চিকিৎসকের কাছে এসেছিলো। তাকে হাসপাতালে অবসারভেসনের জন্য থাকতে বলা হলেও তার বাবা-মা সামান্য বমির জন্য হাসপাতালে থাকতে রাজি হননি। কিন্তু তিনদিন পর ছেলেটি মারা যায় যার কারন ছিলো Septic Shock।

বুঝুন ব্যাপারটি কতটা ভয়ংকর।

Sepsis-এর কারনে বাংলাদেশে, বিশেষ করে আমাদের ঢাকা শহরে কতভাগ রোগীর মৃত্যু হয় সেটির সঠিক হিসাব আমার জানা নেই (এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) তবে সেটির শতকরা হার আশংকা জনকই হবে বলে মনে করি।

একজন রোগী কেন Sepsis-এ আক্রান্ত হয়? এটার কারন আগেই বলেছি। তবে রোগ জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই সকল বিষয়ে পরিষ্কার পরিছন্নতা অবলম্বন করা উচিৎ। দুঃখজনক ব্যাপারটি হলো, আমাদের ঢাকার পরিবেশ এতটাই অপরিছন্ন যে এখানে পরিষ্কার পরিছন্নতার ব্যাপারটি মেইনটেইন করা খুবই কঠিন হয়ে যায়।

কিন্তু হাল ছেড়ে দিলে কি চলবে? সাবধানতার মার নেই ভাই। একজন রোগী যদি সচেতন হন তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার চিকিৎসা করাটা ও সহজ হয়ে যায়। এই যেমন, কোন লক্ষণকেই অবহেলা করা উচিৎ নয়। সময় মতো আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং তার উপদেশ গুলো মেনে চলুন। এতে আপনারই উপকার হবে।

হ্যাঁ, এই কন্ডিশন থেকে বেরিয়ে আসটা একজন রোগীর জন্য অনেক কঠিন বিশেষ বয়স্ক রোগীদের জন্য কামব্যাক করাটা বেশ কঠিন।  কিন্তু তারপরও একজন চিকিৎসক হাল ছেড়ে দেন না। তবে এই ক্ষেত্রে রোগী এবং রোগীর লোকজনদেরকে একজন চিকিৎসককে সহযোগিতা করতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, আমাদের দেশের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্যবস্থা বিগত কয়েক বছরে অনেক উন্নতি করেছে। তবে আইসিইউর খরচ অনেকেই পোষাতে পারেন না। এর জন্য হয়ত অনেক রোগী পিছিয়ে আসেন। সরকারী এবং অনেক বেসরকারী হাসপাতালে সিসিইউ-এর খরচ কিন্তু মানুষের সাধ্যের মধ্যে চলে এসেছে এবং আমি আশা করছি আগামী দিন গুলোতে আইসিইউর এই চিত্রটা বদলাবে। এই ক্ষেত্রে, আই সি ইউর খরচের ব্যাপারটি যদি সরকার কর্তৃক একটি নির্দেশমালা তৈরি করে দেওয়া হয় তাহলে অনেকেই উপকৃত হবেন বলে মনে করছি। আইসিইউর সাথে সম্পৃক্ত চিকিৎসকগন এই ব্যাপারে আরও ভালো বলতে পারবেন।

ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার

 

চিকিৎসকদের পরামর্শ না মেনে চললে দোষটা কার?

বাপ্পির প্রথম ক্যান্সারের চিকিৎসা এত ভালো হয়েছিলো যে, আবার ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা একদম ছিলোই না। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের জাফর মাসুদ ভাই এবং ডেল্টা মেডিকেল কলেজের লাভলু স্যার বাপ্পির যে চিকিৎসা দিয়েছিলেন সেটিত ফলাফল কতটা ভালো হয়েছিলো টা বাপ্পির খাবাএর রুচি এবং ওজন বৃদ্ধি দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। উনাদের দুজনেরই চিকিৎসা এবং ফলোআপ খুবই ভালো হয় এবং তাই উনাদের কাছে রোগীরা ছুটে যান ভালো চিকিৎসার জন্য। আমাদের বাংলাদেশের ডাক্তারেরা অনেক মেধাবী এবং দক্ষ। অন্যায় ভাবে এদেরকে হেয় করা হয়।

এখন রোগী যদি চিকিৎসকের পরামর্শ সঠিকভাবে মেনে না চলেন তাহলে একজন চিকিৎসক কি করতে পারেন? আমি বাপ্পিকে বারবার সাবধান হতে বলতাম যেন কোন রিস্ক ফ্যাক্টর যেমনঃ ধূমপান, জর্দা ইত্যাদি উনি যেন আর ব্যবহার না করেন কারন এগুলো আবার ক্যান্সারকে ফিরিয়ে আনবে এবং তখন সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে।

কিন্তু বাপ্পি মনে করতেন জীবনেও তার আর ক্যান্সার হবে না এবং তাই তিনি লুকিয়ে, লুকিয়ে আমাদের বাসার পাশের দোকানে ধূমপান করতেন। এই ব্যাপারটি আজকে জানলাম। Squamous Cell Carcinoma যদি আবারও গর্জে ওঠার উপাদান গুলো ফিরে পায় তাহলে তার রূপ ভয়ংকর হয়। বাপ্পির ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। কোন কিছুতেই সেটি আর দমে যায়নি। আমি কড়া করে বকা দিয়ে জিজ্ঞেস করতাম তুমি নিশ্চয়ই কোন অকাজ করছ যেটা লুকিয়ে রাখছো। আমার কড়া কথা শুনে উনি অন্যদিকে হাঁটা দিতেন। আমার সন্দেহ ভুল ছিল না। শুধু বেয়াদপ ট্যাগটাই ভাগ্যে জুটত।

ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের সাথে খারাপ আচরন করে কিন্তু সেটির পেছনে কারন থাকে। যত্রতত্র তাদেরকে বেয়দপ উপাধি দেওয়া উচিৎ না। বেয়াদপিটা কারো ভালোর জন্যই করা হয়।

বাপ্পি, তুমি এই কাজ কেন করতে? এর ফলাফলটা কি হলো। তুমি আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলে। বাবার কাঁধে ছেলের লাশ সবচেয়ে ভারী জিনিস আর ছেলের কাঁধে বাবার লাশের ভাঁড়টা কেমন? কবরে নেমে নিজের বাবাকে মাটি দেওয়াটা কেমন ব্যাপার? এটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

মা-বাবাদের বড় সমস্যা হলো, নিজের ছেলে কিংবা মেয়ে ডাক্তার হলেও তাদের কথাকে অবহেলা করা। দরকার পড়লে পাশের বাড়ির ভাবি কিংবা ভাইদের পরামর্শ উনারা নিবেন কিন্তু নিজের ছেলে-মেয়ের পরামর্শ নিবেন না। ঘরে ডাক্তার থাকতে কেন অন্যের কাছে যেতে হবে?

ছেলে হিসেবে আমার নিজেকে খুবই অবহেলিত মনে হয় যখন আমার নিজের মা এবং বাবা আমার পরামর্শকে প্রাধান্য দেন না। দিন শেষে তো আমার কথাই ঠিক হয়। আমার মনে হয় আমার কাতারে আরও অনেকেই আছেন। যারা আছেন তারা আমার ব্যাপারটি খুব ভালোভাবে বুঝবেন।

আমার বাপ্পির ব্যাপারটি সবার জন্য শিক্ষণীয়। আমাদের দেশের চিকিৎসকগন নিজের সেরাটা উজার করে দিয়ে চিকিৎসা দেন কিন্তু আপনারা যদি সাধারন নিয়ম গুলো না মানেন তাহলে দোষটা কার একটিবার ভেবে দেখবেন প্লিজ।

 

ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার