ডেঙ্গুর মতই মারাত্মক জিকা!

504021256-aedes-aegypti-mosquitos-are-seen-in-containers-at-a-lab.jpg.CROP.promo-xlarge2

গত বছরে ব্রাজিলের মেয়ে মারিলা লিমাকে গর্ভাবস্থাতে এডিস মশা কামড় দেয়। লিমার মৃদু জ্বর হয় এবং ব্যাপারটি তিনি তার চিকিৎসক কে অবিহিত করলে উনারা লিমাকে ফলোআপ করতে থাকেন। প্রিনাটাল চেকআপের সময় আলট্রাসনোগ্রাফি স্টাডিতে লিমার গর্ভের শিশুর মধ্যে তার চিকিৎসক কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।

লিমার শিশুটির মস্তিস্ক সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে না। লিমার শিশুটি ছোট মাথা এবং অপরিপূর্ণ মস্তিস্ক নিয়ে জন্মায়। এই রোগের নাম মাইক্রোকেফালি। লিমা তার শিশুটির নাম রেখেছেন আর্থার। কিন্তু এই আর্থারকে নিয়ে লিমার দুঃখের সীমা নেই কারন এসব শিশুদের আয়ুস্কাল খুবই সীমিত হয়।

ব্রাজিলে শুধু আর্থারই নয়। প্রায় ৩৫, ০০০ শিশু এভাবে জন্মেছে।ব্রাজিলের চিকিৎসক ও গবেষকগণ একধরণের ভাইরাসকে দায়ী করছেন এর জন্য যার নাম জিকা ভাইরাস।

২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি জিকা রোগীর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।শুধু ব্রাজিল নয়, দক্ষিন আমেরিকার প্রায় ১৪-টি দেশ এখন জিকা ভাইরাস নামক আতংকের শিকার।

এদিকে গত ১৯ জানুয়ারী যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতে দুজন জিকা ভাইরাসের রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, গত শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারীতে জিকা ভাইরাসের কারণে গর্ভবতী নারীদের ক্যারিবীয় ও লাতিন আমেরিকার ১৪ দেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণ না করার সতর্ককতা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৭ সাল থেকে মোট ২৬ জনের শরীরে জিকা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তারা প্রত্যেকে বাইরে থেকে এ রোগ বহন করে এনেছেন।

জিকা ভাইরাস কি?

জিকা ভাইরাস এক ধরনের ফ্লাভি ভাইরাস। এই ভাইরাসের বাহক এডিস মশা। ১৯৪৭ সালে উগান্ডার জিকা জঙ্গলে রেসাস বানরের শরীরে এই ভাইরাসের অনুসন্ধান মেলে এবং তাই এর নামকরন করা হয় জিকা ভাইরাস।

কিভাবে এই ভাইরাস ছড়ায়?

এডিস মশার কামড়ে মানুষের শরীরে এই ভাইরাস ঢুকে। Aedes aegypti, Aedes africanus, Aedes apicoargenteus, Aedes furcifer, Aedes hensilli, Aedes luteocephalus এবং Aedes vitattus প্রজাতির মশা গুলো এই ভাইরাসের ছড়ানোর জন্য মূলত দায়ী করা হয়। এদের মধ্যে, Aedes aegypti-এর মাধ্যমে জিকা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ছে।

জেনে রাখা ভালো, এই Aedes aegypti ই ডেঙ্গু, ইয়েলো ফিভার এবং চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ভাইরাসও বহন করে। এই মশা দিনে কামড়ায় এবং ঘরের কোণে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ক্যান, টিনের কৌটা, মাটির পাত্র, বোতল, নারকেলের খোসা প্রভৃতিতে জমা পানিতে বংশবৃদ্ধি করে থাকে।

২০০৯ সালে একটি স্টাডিতে দেখা যায় যে জিকা ভাইরাস সেক্সুয়ালি মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। সেই বছর, কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োলজিস্ট ব্রায়ান ফয় সেনেগালে মশাদের নিয়ে গবেষণার সময়ে একাধিকবার এডিস মশার কামড়ের শিকার হন। দেশে ফিরে আসার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসকগন তাকে জিকার রোগী হিসেবে ডায়াগনোসিস করেন। কিন্তু অসুস্থ থাকা অবস্থাতে তিনি তার স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হন এবং কিছুদিন পর তার স্ত্রী ও জিকা রোগে আক্রান্ত হন। এখন পর্যন্ত ফয় একমাত্র ব্যক্তি যিনি সন্ধিপদ প্রাণীবাহী কোন রোগ সেক্সুয়ালি কারও শরীরে প্রবেশ করিয়েছেন।

২০১৫ সালে গবেষণা করে দেখা যায় যে জিকা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত প্রসূতি মার রক্তের মাধ্যমে তা মায়ের গর্ভে থাকা শিশুতে সংক্রামিত করতে পারে।

রোগের উপসর্গ সমূহ

এই রোগের উপসর্গ গুলো অনেকটা ডেঙ্গু জ্বরের মতই।

– হালকা থেকে মাঝারি জ্বর।

– মৃদু মাথা ব্যথা।

– মৃদু শরীর ব্যথা।

– মৃদু চোখ ব্যথা।

– চোখে রক্ত জমে লালচে হয়ে যাওয়া।

– শরীরের জয়েন্ট গুলোতে মৃদু ব্যথা।

চিকিৎসা

– পূর্ণ বিশ্রামে থাকা।

– প্রচুর পরিমানে পানি, স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের শরবত পান করা।

– জ্বর হলে পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে বারবার শরীর মুছে দেওয়া।

– শরীরের তাপমাত্রা কমাতে প্যারাসিটামল গ্রুপের ঔষধ খাওয়া। তবে কোনো অবস্থায়ই ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না।

ডেঙ্গুর ন্যায় জিকার ও কোন ভ্যাক্সিন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি।

গর্ভবতী মায়েরা সাবধান!

ডেঙ্গু কিংবা ইয়েলো ফিভারের ন্যায় জিকা তীব্র থেকে তীব্রতর হয় না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই রোগ থেকে রোগী সুস্থ হয়ে উঠেন। এই রোগে মৃত্যুর হার ও খুবই কম। কিন্তু তারপরও সমগ্র বিশ্বে জিকাকে নিয়ে এত আতংকের কারন কি?

বিশ্বব্যাপি জিকা ভাইরাস নিয়ে হৈচৈ-এর মূল কারন হলো, এটি গর্ভে থাকা শিশুর অনেক ক্ষতিসাধন করে। কিছুদিন আগেও চিকিৎসক এবং গবেষক সমাজ এটাকে গুরুত্ব দিতেন না, কিন্তু ব্রাজিলে বেশ কয়েক মাস ধরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী মায়েরা মাইক্রোকেফালি শিশুর জন্মদানের পর থেকেই জিকা ভাইরাস একটি আতঙ্কে রূপ নিতে থাকে। জিকা ভাইরাস কিভাবে মাক্রোকেফালি করে সেটি এখনও গবেষণারত অবস্থায় আছে।

প্রতিরোধই উত্তম পন্থা

আপাতত জিকা নিয়ে বাংলাদেশের আতঙ্কিত হবার কোন কারন আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে যে কোন ক্ষেত্রেই সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ বলে মনে করি। এই রোগ মূলত আক্রান্ত অঞ্চল থেকে ট্র্যাভেল করে আসা টুরিস্টদের মাধ্যমেই আরেকটি অঞ্চলে ছড়ায়। এই ব্যাপারটি মাথায় রেখে বাংলাদেশের এয়ারপোর্ট গুলোতে উত্তম মনিটরিং-এর ব্যবস্থা রাখা উচিৎ। যেসব লোকজন জিকা আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আসছেন সাথে, সাথেই রক্ত পরীক্ষা করে যেন তাদেরকে শনাক্ত করা যায় সেরকম কোন পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়।

ঘরের আশেপাশে কোথাও যেন পানি জমতে না পারে সেই ব্যাপারটি সর্বদা লক্ষ্য রাখতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাই এর মূল প্রতিরোধ ব্যবস্থা। মশার বংশবৃদ্ধি রোধ, মশা নিধন ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ঘরের আঙিনা, ফুলের টব, বারান্দা, এসির নিচে জমানো পানি নিয়মিত পরিষ্কার করে রাখতে হবে। দিনের বেলা এডিস মশা কামড়ায় বলে দিনে মশানাশক স্প্রে বা মশারি ব্যবহার করতে হবে।

উপরোক্ত পদক্ষেপ গুলো গর্ভবতী মায়েদের জন্য অবশ্যই নিতে হবে। কারন ভুলে গেলে চলবে না জিকা গর্ভবতী মায়েদের গর্ভের শিশুর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর।

বিঃ দ্রঃ এই লেখাটি ২১/০১/২০১৬ তারিখে Healthnewsbd.com এ ছাপা  হয়েছে ডেঙ্গুর মতই মারাত্মক জিকা!

ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার