মানসিক রোগের কারনে ব্যথা?

23মিসেস ফরিদা বেগমের (ছদ্ম নাম) প্রায়ই বুকে ব্যথা হয়। বুকে ব্যথার সাথে তার শ্বাসটা ও আটকিয়ে আসে। কোন দুঃসংবাদ শুনলে, ভয় পেলে কিংবা দুশচিন্তাগ্রস্থ হলেই তার এই সমস্যা দেখা দেয়। এমন কি, কয়েক দফা উনার শ্বাসকষ্টের পরিমান অনেক বেশী ছিলো এবং মাথা ঘুরে পড়েও গিয়েছেন কয়েকবার।

এই সমস্যা নিয়ে তিনি হৃদরোগ, ফুসফুস এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞেদের শরনাপন্ন হয়েছেন অনেকবার কিন্তু বুকের এক্সরে, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম কিংবা রক্তের পরীক্ষা করে তার ফুসফুস কিংবা হার্টের কোন রোগ ধরা পরেনি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন ফরিদা বেগমকে ঘুমের ঔষধ প্রেস্ক্রাইব করেন এবং একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

মানসিক রোগ থেকেও শরীরে অনেক ব্যথার উৎপত্তি হয় যাকে মেডিকেলের ভাষায় সাইকোজেনিক পেইন বলা হয়।

সাইকোজেনিক পেইন কি?

সাইকোজেনিক পেইন কিংবা মানসিক পীড়া এমন কত গুলো রোগের সমষ্টি যার উৎপত্তি শরীরের বিশেষ কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অকার্যকর হয়ে যাওয়া থেকে নয় বরঞ্চ মানসিক অশান্তি, চাপ এবং ভয়ভীতি থেকে আসে।

সাইকোজেনিক পেইন গুলো কেমন হতে পারে?

সাধারন কিছু লক্ষন গুলো হলোঃ

১। মাথা ব্যথাঃ এই ব্যথা ৩০ মিনিট থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং একজন রোগী মাথার দুই দিকে – ডানদিকে এবং বামদিকে – ব্যথার কথা বলেন যা তীব্র নয়। রোগীর মনে হতে থাকে যে কেউ তার মাথা চেপে ধরে আছে।

২। পেটে ব্যথাঃ মানসিক চাপে ভুগতে থাকা একজন রোগীর পেটে অনবরত ব্যথা হতে থাকে তবে সেটি খাওয়া-দাওয়া কিংবা মলত্যাগের সাথে সম্পর্ক যুক্ত নয় এবং সহজে কোন ব্যথানাশকে এই ব্যথা দূর হয় না। একজন রোগীর পুরো পেট জুড়ে কিংবা ওপরের এবং তল পেটে এই ব্যথা হয়।

৩। বুকে ব্যথাঃ বেশীরভাগ রোগীই বুকে ধড়ফড় এবং ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। এদের বুকে ব্যথা পরিশ্রম করলে হয় না বরঞ্চ ভয় পেলে এবং খুব বেশী দুশ্চিন্তা করলে হয়। এদের ইসিজি, ইকো এবং করোনারি এঞ্জিওগ্রাম নরমাল থাকে।

৪। পুরো শরীরে ব্যথাঃ এই ধরনের রোগীরা সমস্ত শরীরে ব্যথা নিয়ে আসেন বিশেষ করে ব্যাকপেইন কিংবা মাজাব্যথা।

উপরে উল্লেখিত ব্যথা গুলোর সাথে, সাথে মাসিক চাপে ভুগতে থাকা একজন রোগী ঘুম কম হওয়া, শ্বাসকষ্ট, খাওয়া-দাওয়া কমে যাওয়া, সারাদিন ক্লান্ত অনুভব করা, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি লক্ষন গুলোর ও বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মানসিক রোগের কারনে এই ধরনের সমস্যার উৎপত্তি যে হয়েছে সেটি ফরিদা বেগম মেনে নিতে চাননি। কারন তার মতে মানসিক রোগ বিভাগে তারাই যান যারা পাগল এবং ফরিদা বেগম নিজেকে পাগল ভাবতে রাজী নন। কিন্তু শুধু পাগল হলেই কি একজন রোগীকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়?

অবশ্যই না।

ফরিদা বেগমের মতো অনেকেই ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তাগ্রস্থতা, ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া কিংবা মানসিকচাপে ভুগছেন এবং এই চাপ থেকেই তাদের মাথা, বুক এবং পেটে ব্যথা হয় যা ওরগানিক কোন পেইন নয় বরঞ্চ এগুলো হলো সোমাটিক পেইন যাদের চিকিৎসা খুবই সহজ যদি সঠিকভাবে এসব রোগ নির্ণয় করা হয়। এবং বলে নেওয়া ভালো যে ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তাগ্রস্থতা কিংবা প্যানিক অ্যাটাকে ভোগা মানেই পাগল হয়ে যাওয়া নয়।

মানসিক রোগ নিয়ে আমাদের দেশের মানুষ এখনও দ্বিধাদ্বন্দে ভোগেন। বিভিন্ন সামাজিক কারনে তারা মানতে চান না যে তাদের মানসিক সমস্যা আছে এবং কোন চিকিৎসক যদি তাকে সুপরামর্শ দেন তাহলে সেই চিকিৎসককে অনেক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়।

কিন্তু রোগীর ক্ষেত্রে ফলাফলটা ভালো হয় না। এই ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তাগ্রস্থতা কিংবা ফোবিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিনা চিকিৎসার ফলে সিজোফ্রেনিয়ার মতো দানব রূপে আবির্ভাব হয় যা কিনা পুরো পরিবারকে কাঁদিয়ে ফেলে।

একজন চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিঃ দ্রঃ এই লেখাটি ২৪/১১/২০১৫ তারিখে Healthnewsbd.com এ ছাপা হয়েছে  মানসিক রোগের কারনে ব্যথা?
ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s