শ্বাসকষ্ট মানে শুধুই হাঁপানি নয়

lungs_1ফরিদ সাহেব (ছদ্ম নাম) একজন সুখী মানুষ। নিজের সফল ব্যবসা এবং সুখের সংসার নিয়ে বেশ ভালোই কাটছে তার দিন। তবে নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উনি তেমন সচেতন নন। ছোটবেলা থেকে তিনি বড় ধরনের কোন রোগে ভোগেননি বলে নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে খেয়াল রাখার তেমন প্রয়োজন তিনি কখনো অনুভব করেননি ।

বেশ কিছুদিন ধরে তিনি লক্ষ্য করলেন যে হাঁটার সময় তার শ্বাস নিটে বেশ কষ্ট হচ্ছে এবং সেই সাথে বুকের মধ্যভাগে কিঞ্চিৎ চাপ ও অনুভব করছেন। ব্যাপারটি নিয়ে তিনি কোন চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ না করে, তার এক নিকট বন্ধুর সাথে কথা বলেন।

বন্ধুটি তাকে অভয় দিয়ে বললেন যে এটি হাঁপানি এবং সে নিজেও এই সমস্যায় ভুগছেন এবং তার জন্য একটি ইনহেলার ব্যবহার করছেন। তিনি ফরিদ সাহেবকে সেই ইনহেলার ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। বন্ধুর পরামর্শ অনুযায়ী ফরিদ সাহেব সেটি ব্যবহার শুরু করেন।

কিন্তু ইনহেলার ব্যবহার করার পরও ফরিদ সাহেবের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। একরাতে তার শ্বাসকষ্ট সহ বুকে ব্যথা শুরু হয়। তার স্ত্রী তাকে বিএসএসমইউ-এর কার্ডিয়াক ইমারজেন্সিতে নিয়ে আসেন। কর্তব্যরত চিকিৎসক তার একটি ইসিজি করান যেখানে দেখা যায় যে ফরিদ সাহেবের হৃদরোগ রয়েছে।

আমাদের দেশে এখনও শ্বাসকষ্টকে শুধু হাঁপানি কিংবা অ্যাজমার লক্ষন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু হাঁপানিতে শুধুমাত্র শ্বাসকষ্ট হয় না। বরং অন্যান্য রোগেও শ্বাসকষ্ট হয় যার জন্য একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা খুবই জরুরী।

কি কি কারনে শ্বাসকষ্ট হতে পারে?

খুবই কমন কারন গুলো হলোঃ

১। ফুসফুসের সমস্যাঃ খুবই কমন কিছু রোগ যেমনঃ হাঁপানি, সিওপিডি, ফুসফুসের প্রদাহ যেমন নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, ফুসফুসের রক্ত সবরাহকারি রক্তনালীতে সমস্যা এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের কারনে একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করতে পারেন।

২। হৃৎপিণ্ডের সমস্যাঃ হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী গুলো ব্লক হয়ে গেলে একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। মানবদেহের হৃৎপিণ্ড সঠিক ভাবে রক্ত না পেলে অ্যানজাইনা, হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলর জাতীয় রোগ হয় যেগুলোতে শ্বাসকষ্ট হয়।
তাছাড়া, হৃৎপিণ্ডের জন্মগত ত্রুটি, হৃৎপিণ্ডের প্রদাহ, হৃৎপিণ্ডের মাংস বৃদ্ধি এবং রেট এবং রিদম কিংবা ইলেক্ট্রিক্যাল ইম্পালস চলাচলে সমস্যা হলে ও একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন।
৩। রক্তশূন্যতাঃ রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলেও একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন।
৪। স্থুলতাঃ কারও শরীরের ওজন যদি বেড়ে যায় তাহলে শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য ব্যবহৃত পেশী গুলো অনেক দুর্বল হয়ে যায় এবং তখন একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন।
৫। শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার রাস্তাতে কোন সমস্যাঃ এসব রাস্তা গুলো যদি কোন কারনে আটকে যায় তাহলে একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন।
৬। মানসিক রোগঃ মানসিক রোগ যেমন Generalized Anxiety Disorder বা দুশ্চিন্তা গ্রস্থ রোগ এবং Panic Disorder থেকেও একজন রোগীর শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয়।
৭। স্নায়ুরোগঃ স্নায়ুরোগ যেমনঃ Guillian-Barre Syndrome, Myasthenia Gravis এবং স্ট্রোক থেকে একজন রোগী শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন।
উপরে উল্লেখিত সমস্যা গুলো ছাড়াও বুকের হাড় ভেঙ্গে গেলে, কার্বনমনোক্সাইডের বিষক্রিয়া, খাবারের সময় খাদ্যনালীতে খাবার আটকে গেলে ইত্যাদি কারনেও শ্বাসকষ্ট হয়।
শ্বাসকষ্ট হলে আপনাকে যেসব ব্যাপার গুলো খেয়াল রাখতে হবেঃ
* যদি শ্বাসকষ্টের সাথে আপনার কাঁশি থাকে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার সময় যদি আপনার কানে বাঁশির মতো কোন শব্দ ভেসে আসে তাহলে বুঝতে হবে আপনার হাঁপানি রোগ হয়েছে। সেই সাথে, এই শ্বাসকষ্ট যদি শীতকালে এবং ধুলোবালির সংস্পর্শে বেড়ে যায় তাহলে সেটি হাঁপানি রোগের লক্ষন।
* ভারী কোন কাজ করলে কিংবা হাঁটাহাঁটির সময় শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে খেয়াল করবেন বুকের মধ্যভাগে কিংবা বামদিকে চাপ দেওয়া কিংবা চিনচিন ব্যথা অনুভূত হয় কিনা এবং বিশ্রাম নেবার সাথে, সাথে আবার সেই ব্যথা যদি চলে যায় তাহলে Ischaemic Heart Disease-এর সন্দেহ করতে হবে।
* ভারী কাজ করার সময় শ্বাসকষ্ট এবং সেই সাথে যদি বুক ধড়ফড়, অনেকদিন ধরে শরীরের ব্যথা এবং সময় সময়ে জ্বরের ইতিহাস থাকে তাহলে সন্দেহ করতে হবে আপনার হার্টের ভাল্ব গুলোতে কোন সমস্যা হয়েছে।

* বুক জ্বালাপোড়া করার সাথে, সাথে যদি শ্বাসকষ্ট অনুভূত হয় তাহলে হাঁপানি এবং Iscahemic Heart Diasease এই রোগ দুটির কথা মাথায় রাখতে হবে।
* অধিক দুশ্চিন্তা করার সময় কিংবা ভয় পেলে যদি খেয়াল করেন যে আপনার শ্বাসপ্রশ্বাস খুব দ্রুত হচ্ছে এবং আপনি শ্বাস নিতে পারছেন না তাহলে Generalized Anxiety Disorder এবং Panic Disorder নামক মানসিক রোগ গুলোর কথা মাথায় আনতে হবে।
* শ্বাস নিতে কষ্ট হলে খেয়াল করুন আপনার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে কিনা। যদি মুখটা ফ্যাকাসে দেখায় এবং হাতের পাতার সেই গোলাপী ভাবটা আর নেই তাহলে রক্তশূন্যতার ব্যাপারটি সন্দেহ করুন।

উপরে খুবই সাধারণ কিছু রোগের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে।

একটি লক্ষণ নানা ধরনের রোগের ইন্ডিকেসন দেয় আর তাই, যেকোন সমস্যায় অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। অবহেলা করলে আপনার অবস্থা কিন্তু ফরিদ সাহেবের মতোই হবে।

এই লেখাটি ১৭/১০/২০১৫ তারিখে Healthnewsbd.com এ ছাপা হয়েছে শ্বাসকষ্ট মানে শুধুই হাঁপানি নয়

ধন্যবাদ

ফয়সাল সিজার

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s